Thursday, June 29, 2023

শ্রীজগন্নাথদেবের লীলাকথামৃত



পুণ্ডরীক ও অম্বরীষ উদ্ধার

এক সময়ে কুরুক্ষেত্রে পুণ্ডরীক নামক একজন ব্রাহ্মণ এবং অম্বরীয় নামক একজন ক্ষত্রিয় বাস করত। তারা পরস্পর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। তারা সদ্বংশে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও তারা তাদের সকল সগুণাবলী বিসর্জন দিয়ে নানারকম পাপকর্মে আসক্ত হয়ে পড়েছিল। তারা কখনো তাদের নিজ নিজ বর্ণোচিত নিত্যকর্ম, ব্রতাদি করত না। তারা সুরা পান করত এবং বারবণিতাদের সঙ্গ করত। দেহান্তে তারা কি গতি লাভ করবে এ নিয়ে তাদের কোনো উদ্বেগ ছিল না।

পুণ্ডরীক ও অম্বরীষ উভয়ে একবার অর্থোপার্জনের উদ্দেশ্যে অন্য দেশে যেতে মনস্থ করল। ইতস্তত পরিভ্রমণ করতে করতে তারা এমন একটি স্থানে পৌঁছাল যেখানে সাধু-ঋষিগণ যজ্ঞানুষ্ঠান করছিলেন। বহু দূর থেকে তারা শাস্ত্রপাঠের ধ্বনি শুনতে পাচ্ছিল। এইসব পবিত্র পারমার্থিক কার্যকলাপ দর্শন করে তাদের মনে পরিবর্তন এল। তারা আধ্যাত্মিক জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হল। “আমরা কতই না পাপকর্ম করেছি,” সেই বন্ধুদ্বয় অনুশোচনা করতে লাগল। “কিভাবে আমরা পাপমুক্ত হব? কেমন করে আমাদের পাপমোচন হবে? আমরা যেসব জঘন্য পাপ করেছি, শাস্ত্রে তার বর্ণনা মেলা ভার। সেইসব পাপকর্মের প্রতিক্রিয়া হতে মুক্ত হবার জন্য শাস্ত্রের উপদেশ কি? এসো আমরা যজ্ঞার্থে সমবেত এইসব সাধুগণের নিকট একথা জিজ্ঞাসা করি। নিশ্চিতভাবেই তাঁরা আমাদের উদ্ধার লাভের কিছু উপায় বলতে পারবেন।”

অত্যন্ত বিনম্রচিত্তে সাধুগণের নিকট উপনীত হয়ে পুণ্ডরীক ও অম্বরীষ তাঁদের কাছে সবিস্তারে তাদের পাপকর্মের বর্ণনা দিল, তারপর সাধুগণের কাছে জানতে চাইল যে কিভাবে তারা যমদণ্ড হতে অব্যাহতি পেতে পারে। যখন সেই সাধুবর্গ তাদের পাপের বিবরণ শ্রবণ করছিলেন, তখন সেই বিবরণ এতই বীভৎস ছিল যে তাঁরা চোখ বন্ধ করেছিলেন। তাঁদের কেউ এইসব অতি গর্হিত পাপকর্মের উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্তের বিধান দিতে পারলেন না।

সেখানে একজন মহাবৈষ্ণব ছিলেন যিনি ছিলেন ঐ সাধুগণের মধ্যে প্রধান। তিনি ঐ বন্ধুদ্বয়কে কিছু কথা বললেন যা তাঁদের অন্তরে আশার সঞ্চার করল। তিনি বললেন, “হে ব্রাহ্মণপুত্র ও ক্ষত্রিয়পুত্র, তোমরা যদি এইসব ঘৃণ্য পাপকর্মফল থেকে মুক্ত হতে চাও, তাহলে অবিলম্বে পুরুষোত্তম ক্ষেত্রে গমন কর। এই স্থান সকল তীর্থের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। এখানে পুরুষোত্তম ভগবান সর্বাপেক্ষা করুণাময় এক মূর্তিতে তাঁর এক ভক্ত, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের শ্রীজগন্নাথ ভক্তিতে প্রীত হয়ে প্রকটিত হয়েছেন। এই বিগ্রহ, শ্রীজগন্নাথের পূজারাধনা করার ফলে কেবল তোমাদের সর্বপাপ মোচনই হবে না, তোমরা জড়বন্ধন হতেও মুক্ত হবে। কেবল তাঁর দর্শনমাত্রই তোমরা তোমাদের সকল পাপ তে মুক্ত হবে। এই জগদীশের শরণগ্রহণ করো, যিনি উৎকল প্রদেশে, নীলাচল পর্বতের উপর বিরাজ করছেন। করুণাময় প্রভু নিশ্চয়ই তোমাদের সকল মনোবাসনা পূর্ণ করবেন।” 

ঐ বৈষ্ণবের নিকট থেকে এই সদুপদেশ প্রাপ্ত হয়ে পুণ্ডরীক ও অম্বরীষ প্রসন্নমনে পুরুষোত্তম ক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন। ভগবান শ্রীজগন্নাথের মহিমা শ্রবণ করে। তাঁদের চিত্তে বৈরাগ্য ও অনাসক্তির উদয় হল। তাঁরা কুসঙ্গ পরিহার করে ভক্তিযুক্ত সেবা অনুশীলন করতে শুরু করলেন। কয়েকদিন পর তাঁরা পুরীধামে পৌঁছলেন। তাঁরা মহোদধি, সমুদ্রে স্নান করে মন্দিরের দিকে অগ্রসর হলেন। মন্দিরের প্রবেশ দ্বারে উপনীত হয়ে তাঁরা সাষ্টাঙ্গ প্রণাম নিবেদন করলেন। কিন্তু সেইসময়ে তাঁরা শ্রীজগন্নাথ ও অন্যান্য বিগ্রহসমূহের দর্শন পেলেন না। উৎকণ্ঠায় তাঁদের হৃৎকম্প হতে শুরু করল, তখন পুণ্ডরীক ও অম্বরীষ ভগবানের দর্শন না পাওয়া পর্যন্ত উপবাস করার সঙ্কল্প করলেন। তাঁরা নিরন্তর প্রভুর দিব্যনাম গ্রহণ করতে লাগলেন। তৃতীয় রাত্রে তাঁরা মন্দিরের অভ্যন্তর থেকে জ্যোতিঃপ্রভা নির্গত হতে দেখলেন। ভক্তদ্বয় উপবাস অব্যাহত রেখে অবিশ্রান্তভাবে ভগবানের দিব্যনাম জপ করতে লাগলেন। পরিশেষে, সপ্তম রাত্রে তাঁরা শ্রীজগন্নাথের দর্শন লাভ করলেন। সকল পাপ-কলুষতা থেকে সম্পূর্ণ বিমুক্ত হয়ে এবং অপ্রাকৃত জ্ঞান ও দিব্য আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে পুণ্ডরীক ও অম্বরীষ তাঁদের অবশিষ্ট জীবন নীলাচল ধামে শ্রীজগন্নাথের সেবায় অতিবাহিত করলেন।



No comments:

Post a Comment

শ্রীজগন্নাথদেবের লীলাকথামৃত

পুণ্ডরীক ও অম্বরীষ উদ্ধার এক সময়ে কুরুক্ষেত্রে পুণ্ডরীক নামক একজন ব্রাহ্মণ এবং অম্বরীয় নামক একজন ক্ষত্রিয় বাস করত। তারা পরস্পর ঘনিষ্ঠ বন্...